ব্ল্যাকবোর্ড - সিনেমার আগে পরে পেছনে




ব্ল্যাকবোর্ড - সিনেমার আগে পরে পেছনে
মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায় [Mrigankasekhar Ganguly ]

যেন ঈশ্বর
নোংরায় বসে
কটা ভাঙাচোরা মানুষ
বিক্রি করছেন
অল্প কটা টাকায়।
কবিতাটা কিছুটা এভাবেই শেষ করছেন জাভেদ আখতার। কচ্চী বস্তি - নাম।
আমাদের কারো কোন গল্প নেই।  বানিয়ে আমরা কিছুই বলতে পারি না। এমন ভাবে বলি যাতে গল্পের মত শোনায়, আর কিছু না। আমাকে নিয়ে যিনি গলির ভেতর ঢুকলেন, লম্বা, সুঠাম চেহারা। কথা বলেন আস্তে, নম্র ভাবে।  তার শরীরে চারটে ফুটো, গুলির। শান্ত চাহনি। বললেন, "কাজ করো, কোন অসুবিধা নেই। ও লাট্টু। যবে আসবে একদিন আগে ফোন করে নিও। " গলিটা বড় রাস্তা থেকে ভেতরে ঢুকেছে। রাস্তার গা ঘেষে নীচু ছাদ বাড়ি, লম্বায় আমার সমান। কিছু এগিয়ে একটা টাইম কল। ভিড় করে কাপড় কাচছেন মহিলারা। বাচ্চারা স্নান করছে। একটু এগিয়ে পরপর চারটে পায়খানা। ওখানে সবাই এগুলিই ব্যবহার করেন। গলিটা একটা বড় উঠনে এসে শেষ হয়। উঠনের মাঝে একটা কুয়ো। উঠোন ঘিরে গোল করে বেড়ার ঘর। ঘরের সামনে খাটিয়া। কোণায় ছোট গোয়াল। কটা মহিষ বাঁধা। উঠোন পেরিয়ে একটা সরু রাস্তা ভেতরে চলে গেছে। ড্রেনের পাশ বরাবর। ড্রেনের জল উপচে পড়ে জমেছে পাশের ঘরগুলোয়। গলিটার প্রতিটা বাঁকেই জায়গাটা চরিত্র বদলাচ্ছে। এখানে যেমন একটা টানা দোতলা প্যাসেজ। খোপ খোপ ঘর। ঘরের গায়ে নম্বর প্লেট। রাস্তার মাঝখান থেকে সিঁড়ি উঠেছে দু দিকে।
বস্তিটা কবে হয়েছে জানা নেই। মাঝ বরাবর ভাগ হয়ে একদিকটায় হিন্দুস্থানী ঘর। আর একদিকে মুসলিম। দুই ভাগের আলাদা দুই 'দাদা'। গল্প লেখার সময় কোন বস্তির কথা ভেবে লিখি নি। কিন্তু সিনেমা করার সময় স্পট খুঁজে  বের করতে হবে। তন্ময় পূরব অনির্বাণ,  কিংশুক বেরিয়েছিল। আমার কোন কারণে হয় নি , সেদিন। অনেকগুলো জায়গা দেখে ফেলল, কিন্তু পছন্দ হচ্ছে না। প্রথমে তন্ময়-পূরবের সাথে কথা হয়েছিল, কাউকে বুঝতে না দিয়ে ক্যামেরা অন করে গোটা বস্তিটা ঘোরা হবে। অনেকটা গেরিলা কায়দায়। কিন্তু সেভাবে কাজ করা সম্ভব হবে না জানাল পূরব। তাই পরিচিত জায়গা না হলে মুশকিল। কি করা যায়? গেলাম কৃষাণু স্যারের বাড়ি। সেদিন সুশান্ত দাও এসেছেন। সেই আলাপ। আমাদের কথা শুনে বললেন, চল। অটোতে পনের মিনিট। আগরপাড়ায়। একটা কারখানার পেছনে। বি টি রোডের পাশে। ওখানের এক দাদা, সুশান্ত দার পরিচিত। তিনিই সব ঘুরে দেখালেন। বললেন, কাজ কর, কোন অসুবিধা হবে না। তিন দিনের শুটিং ছিল। ওখানের ছোটরাই অভিনয় করল। ওম, যে এই গল্পটা বলছে। খয়েরি চুল। যার গেঞ্জিটা খেয়াল করলাম, পিছনে লেখা NO FUTURE। তিন চার দিন আমরা একসাথে ঘুরলাম, খেলাম, কাজ করলাম। ওকে ওর বাড়িতে যখন ছেড়ে এলাম, ওর বাবা মা দাঁড়িয়ে দরজায়। বললেন, তোমরা তো বাচ্চা,  টাকার কথা কি বলব। বড় হও।
গল্পটা শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগের বইমেলায়। পৃথ্বীরাজ দার সাথে ঘাসে বসে আড্ডা চলছে। দেখি, কটা বাচ্চা। এমনি কটা বাচ্চা। যেমন হয়, নিজের থেকে বড় জামা, ঢলঢলে। প্যাণ্টটা গুটিয়েছে অনেক ফোল্ড। কটা রঙিন কাগজ বিলচ্ছে বইমেলায়। আমার হাতে আসতে, দেখলাম- কোন এক মডেল স্কুলের বিজ্ঞাপন। হয় না-  আসুন ভর্তি করুন আপনার বাচ্চাকে, পড়াশোনার সাথে সুইমিং পুল, ঘোড়া চড়া, এরকম কিছু। আমি দেখলাম, স্কুল-না-পাওয়া ছোট ছেলেটা বিলচ্ছে শিক্ষার বিজ্ঞাপন। গল্পটা মাথায় এভাবেই। ব্ল্যাকবোর্ড। সদ্য গোঁফ রেখার ছেলেটা বলছে। -আমরা এখানে থাকি। এটাকে বস্তি বলে। বাবা বলে এসব জমি আমাদের না। গুণ্ডা আসে। বলে উঠে যাও। ঝগড়া হয় মারামারি হয়।...  কুকুর গরু ছাগল আমরা একসাথে থাকি।... আমাদের কোন স্কুল নেই। আমাদের কেউ লেখা পড়া করতে বলে না। মা বলে, লেখা পড়া বড়লোকদের। আমাদের খাওয়া পড়ার ঠিক নেই।...  সকাল হলেই আমরা কাজে বেরিয়ে পড়ি। ময়লা তোলা, জুতো পালিশ, চায়ের দোকান... তন্ময় এখানে সাবটাইটেল করেছিল,  we decor our city with our labour. ছেলেটা বলে যাচ্ছিল, আমি বড় হলে বাবা নিয়ে গেল তপন কাকার কাছে। তপন কাকা লিফলেট বিলির কাজে ঢুকিয়ে দিল। স্টেশনে, বাজারে, স্কুলের সামনে লিফলেট বিলি করতে লাগলাম।...

বহুবার এই লেখা নিয়ে বসেছি। কি বলব। কিভাবে বলব। লেখা হয় নি। বস্তি চেনা শব্দ। চোখে কানে সিনেমায়। গরিবি পরিচিত ছক। পরীক্ষামূলক দুটো সিনেমার পর মাথা  ঝিঁ ঝিঁ।  মানুষের মাথা টপকে যাওয়া ইণ্টারন্যাশানাল এওয়ার্ড কলার তুলেছিল কতকটা। কদিনের জন্য। তারপর মনে হল, একটা সহজ গল্প বলা থাক। মানেবই নিয়ে বসতে হবে না। পাতার পর পাতা লিখে বোঝাতে  হবে না। মনে হবে, ট্রেনে আসতে আসতে শোনা গল্পটা, মায়ের কাছে ছেলেবেলায়, ক্লাসে ফিসফিস বন্ধুর মুখে। তাই প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ( stark electric jesus) বানানোর মাস খানেক পর যখন তন্ময় তৃতীয় প্রজেক্টের কথা তুলল, তখন লিখতে বসলাম গল্পটা-  ব্ল্যাকবোর্ড। ছবিটার দুটো ভাগ ছিল। একটায় বস্তির পরিবেশ আর কলকাতার রাস্তায় শিশুশ্রম ডকুমেন্ট করা আর দ্বিতীয়টায় গল্পটা বলা। কলকাতার রাস্তা বেরিয়ে কাজ করাটা একটা সমস্যা ছিল, মূলত বাচ্চাদের দিয়ে কাজ করানোর, ছবি তোলা। অনেক জায়গাতেই ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে দোকানি, কি হচ্ছে? - আমরা কলেজের ছাত্র, কলকাতার ওপর ডকুমেণ্ট্রি করছি। কোথাও কোথাও কিংশুক কে দাঁড় করিয়েছি, যেন ওর ছবি তুলছি, ক্যামেরা আড়াল করে তুলেছি কোথাও। বুঝতে পারলে ক্যামেরা তো যাবেই, বেশি কিছুও হতে পারে- এই ভয়টাও কাজ করছিল। আর একটা সমস্যা ছিল, প্রচণ্ড গরম। ৪১ - ৪২  ডিগ্রি । পরে জানলাম সেটাই শহরের উষ্ণতম দিন। মাঝ পথে পূরব অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমার ওপর দায়িত্ব বর্তায় ক্যামেরার করার, কিন্তু এই বাকি কাজের জন্য সিনেমাটোগ্রাফি বিভাগে নিজের ক্রেডিট নিতে মন সায় দেয় নি। বরং পূরবকে এসিস্ট করেছি, এটা ভাবতেই বেশি ভালো লাগে। তাই  IMDB তে  Cinematography by  Purab Mukherjee, Mrigankasekhar Ganguly (uncredited)। তা ছাড়া সর্ব ঘতে কাঁঠালি কলা বলে, আমার একটা দুর্নাম তো রয়েছেই। আমাদের একটা খুব বাজে ধারণা আছে, অবাস্তব ছবি নায়কের আর বাস্তব ছবি ডিরেক্টারের। । a film by অমুক (পরিচালক)। নিদেন পক্ষে  অভিনন্দনের সময় ডিরেক্টর এন্ড হিস টিম। আমি যে কটা কাজ করেছি, তার থেকে এটা ধারণা হয়েছে, ডিরেক্সান একটা পদ ছাড়া কিছু না। যেমন লাইট, সাউণ্ড, ফলি - তেমনই ডিরেক্সান। এই কথাটা আমি বহুবার আগে বলেছি, কিন্তু ব্যাপারটা বদলায় নি। যারা সিনেমা তৈরির ভেতরটা জানেন না নেহাতই দর্শক, তাদের ব্যাপারটা আলাদা। কিন্তু সিনেমার সঙ্গে যুক্ত মানুষ জনের যে কেন এই ধারণাটা মাথায় ঢুকে থাকে বুঝি না। নিজেই নিজের কলার তোলা ডিরেক্টারের সংখ্যাও কম নয়। বাকি ক্রিউ দের বাদ দিয়ে শুধু নিজের নামটা ফলাও করে পোস্টারে রাখেন, তার নামটা বেশিক্ষণ ধরে স্ক্রিনে থাকে। আমি আমাদের প্রতিটা ছবিকেই ছবি তৈরীর টিমের সবার বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তাই অনুরোধ করব, অভিনন্দন জানাতে হলে, টিম-ব্ল্যাকবোর্ডকে জানান, নিন্দা করতে হলেও।

(আপাতত/ক্রমশ)

*Technical কারণে কিছু শুদ্ধ বানান লেখা সম্ভব হল না।

No comments:

Post a Comment